ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে আয়োজিত প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে অংশ নেওয়া বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদলের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়েছে। অনুষ্ঠানটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, বিদেশি প্রতিনিধিদলগুলো একে একে খামেনির কফিনের কাছে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করার সময় প্রতিটি প্রতিনিধিদলের প্রবেশের সঙ্গে আলাদা আলাদা কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয়।
রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায়, বিদেশি প্রতিনিধিদলগুলো যখন একের পর এক আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির কফিনের কাছে গিয়ে তার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, তখন প্রতিটি প্রতিনিধি দলকে পবিত্র আল কোরআনের আলাদা আলাদা আয়াত তেলাওয়াতের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হচ্ছে।
বিষয়টি ঘিরে বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকের মতে, এসব আয়াত নির্বাচন ধর্মীয় প্রতীকবাদের মাধ্যমে বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে তেহরানের কৌশলেরই একটি উদাহরণ।
৯ দেশকে কোরআনের ৯ আয়াতের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক বার্তা
১. বাংলাদেশ (সূরা আলে ইমরান, ১৬৯–১৭০)
এখানে শহীদদের মর্যাদা ও আল্লাহর পথে প্রাণ উৎসর্গকারীদের সম্পর্কে আয়াতটি তেলাওয়াত করা হয় বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির সময়।
এই আয়াতের অর্থ: আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে তুমি কখনো মৃত মনে করো না; বরং তারা নিজেদের রবের নিকট জীবিত, তারা রিযিকপ্রাপ্ত।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই আয়াত তেলাওয়াতকে একটি প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হয়েছে—যেখানে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, আন্দোলন বা সংঘাতে প্রাণ হারানোদের স্মরণ ও তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি বার্তা হিসেবে এটিকে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
২. পাকিস্তান
পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির সময় সূরা বনি ইসরাইল (ইসরা) এর ৮০ নম্বর আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে আল্লাহর কাছে কল্যাণের সঙ্গে প্রবেশ ও কল্যাণের সঙ্গে বের হওয়ার পাশাপাশি সাহায্যকারী শক্তি প্রার্থনার কথা বলা হয়েছে।
আয়াতের অর্থ- বলো, ‘হে আমার প্রতিপালক! আমাকে প্রবেশ করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং আমাকে নিষ্ক্রান্ত করাও কল্যাণের সঙ্গে এবং তোমার নিকট হতে আমাকে দান করো সাহায্যকারী শক্তি।
এই আয়াতটি মূলত একটি দোয়ারূপে পরিচিত, যা নিরাপত্তা, সাফল্য ও সঠিক পথে পরিচালিত হওয়ার জন্য প্রার্থনার প্রতীক।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই তেলাওয়াতকে এক ধরনের প্রতীকী ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যেতে পারে—যেখানে আঞ্চলিক সংকট ও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের মধ্যস্থতাকারী বা ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের প্রতি ইঙ্গিত থাকতে পারে। কারও মতে, এটি তাদের কূটনৈতিক ভূমিকার প্রতি সম্মানসূচক বার্তা হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
৩. আফগানিস্তান (সূরা আল-ফাতহের প্রথম আয়াত—যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে “স্পষ্ট বিজয়” দানের কথা বলা হয়েছে)
তেলাওয়াত করা হয় আফগান প্রতিনিধিদলের আগমনের সময়।
আফগানিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকির নেতৃত্বে তালেবান প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে প্রবেশ করলে এই আয়াত শোনানো হয় বলে জানা যায়। বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, দীর্ঘ দুই দশকের যুদ্ধ শেষে বিদেশি সেনা প্রত্যাহার এবং ক্ষমতার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আফগানিস্তানের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই আয়াতকে যুক্ত করে একটি প্রতীকী ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
৪. ফিলিস্তিন (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ১) আয়াতের অর্থ: পরম পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা (বায়তুল মুকাদ্দাস) পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি, তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
ফিলিস্তিনি প্রতিনিধিদলের সামনে ইসলামের প্রথম কিবলা আল-আকসার আয়াতটি তিলাওয়াত করার অর্থ ছিল অত্যন্ত গভীর। এর মাধ্যমে ইরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে, খামেনির বিদায়ের পরেও ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা এবং জেরুজালেম মুক্ত করার লড়াই ইরানের কাছে সবচেয়ে পবিত্র এবং অবিচ্ছেদ্য এজেন্ডা হয়ে থাকবে।
৫. কাতারি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির সময় সূরা আল-ফাতহের প্রথম তিন আয়াত তেলাওয়াত করা হয়, যেখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে “স্পষ্ট বিজয়”, অনুগ্রহ এবং পথনির্দেশনার কথা বলা হয়েছে।
আয়াতের অর্থ: নিশ্চয় আমি আপনাকে সুস্পষ্ট বিজয় দান করেছি, যেন আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যতের ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেন আর আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন। এবং আল্লাহ আপনাকে বলিষ্ঠ সাহায্য দান করেন।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, কাতারের ক্ষেত্রে এই তেলাওয়াতকে একটি প্রতীকী বার্তা হিসেবে দেখা যেতে পারে—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকার প্রেক্ষাপটে। তাদের মতে, এটি কাতারের কূটনৈতিক সক্রিয়তা ও আঞ্চলিক ভূমিকার প্রতি এক ধরনের ইঙ্গিতপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবেও ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
৬. তুরস্ক (সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৯৫) আয়াতের অর্থ: মু’মিনদের মধ্যে যারা অক্ষম নয় অথচ ঘরে বসে থাকে ও যারা আল্লাহর পথে স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে তারা সমান নয়। যারা স্বীয় ধন-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করে আল্লাহ তাদেরকে, যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন; আল্লাহ সকলকেই কল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যারা ঘরে বসে থাকে তাদের ওপর যারা জিহাদ করে তাদেরকে আল্লাহ মহাপুরস্কারের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন।
তুরস্ক মুখে ফিলিস্তিন বা মুসলিম উম্মাহর পক্ষে অনেক বড় বড় কথা বললেও বাস্তবে ইসরাইল বা পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো সামরিক বা শক্ত অর্থনৈতিক পদক্ষেপ নেয় না। এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান তুরস্কের সেই ‘ঘরে বসে থাকা’ বা নিষ্ক্রিয় নীতিকে ইঙ্গিত করে এক ধরণের সূক্ষ্ম কূটনৈতিক ভর্ৎসনা করেছে।
৭. রাশিয়া (সূরা আল-আহযাব, আয়াত: ২৩) আয়াতের অর্থ: মু’মিনদের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে, যারা আল্লাহর সাথে কৃত তাদের ওয়াদা বা অঙ্গীকার সত্যে পরিণত করেছে (অর্থাৎ তা রক্ষা করেছে)। অতঃপর তাদের কেউ কেউ নিজের মানত পূর্ণ করেছে (শহীদ হয়েছে) এবং কেউ কেউ প্রতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোনো পরিবর্তন করেনি।
রাশিয়াকে বিপদের সময় কাছে পেয়েছিল ইরান। সেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতিনিধি দলের জন্য ছিল এই আয়াত। বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাশিয়া ও ইরান দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত কৌশলগত মিত্র। সে হিসেবে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর এত চাপ সত্ত্বেও রাশিয়া যেভাবে ইরানের সাথে দেওয়া সামরিক ও কূটনৈতিক "ওয়াদা বা অঙ্গীকার" ধরে রেখেছে, এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান প্রকারান্তরে রাশিয়াকে ঠিক সেই বিশ্বস্ত এবং অটল বন্ধুত্বেরই এক অনন্য সার্টিফিকেট দিয়েছে।
৮. সৌদি আরব
সূরা আলে-ইমরান (আয়াত ১৩) তেলাওয়াত করা হয় সৌদি প্রতিনিধিদলের উপস্থিতির সময়, যেখানে ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মুমিন ও অবিশ্বাসীদের সংঘর্ষের কথা বর্ণনা করা হয়েছে।
আয়াতের অর্থ: আল্লাহ তাআলা বলেছেন:"নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য নিদর্শন ছিল সেই দুটি দলের মধ্যে, যারা পরস্পর মুখোমুখি হয়েছিল। একটি দল লড়াই করছিল আল্লাহর পথে এবং অপর দলটি কাফির। তারা (কাফিররা) বাহ্যিক দৃষ্টিতে তাদেরকে (মুমিনদের) ওদের দ্বিগুণ দেখছিল। আর আল্লাহ নিজ সাহায্য দ্বারা যাকে চান শক্তিশালী করেন। নিশ্চয় এতে চক্ষুষ্মানদের জন্য শিক্ষা রয়েছে।
এই আয়াত সাধারণভাবে সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব, এবং আল্লাহর সাহায্যে এক পক্ষের বিজয়ের শিক্ষা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে,সাম্প্রতিক সময়ে যখন আমেরিকা ও ইরান পরস্পর যুদ্ধ করছিল, মজলুমের পাশে না দাঁড়িয়ে বরং নীরব থাকা, কিংবা ওই কাফের সৈন্যদলকেই সহযোগিতা করা সৌদি শাসকদের ভূমিকাকে এরচেয়ে চমৎকারভাবে তুলে ধরা আর সম্ভব ছিল না। সেসময় ভরা মজলিশে সৌদি নেতাদের উদ্দেশে আয়াতের মাধ্যমে এমন বার্তা মূলত: সংঘাতের সময় ইরানের প্রতি সৌদির কৌশলগত আচরণেরই প্রতীকী ছিল।
৯. ভারত
সূরা আলে-ইমরান (আয়াত ১৭৩) তেলাওয়াত করা হয় ভারতীয় প্রতিনিধিদলের জন্য, যেখানে বলা হয়েছে—বাইরের ভয়ভীতি ও চাপ সত্ত্বেও মুমিনদের ঈমান আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে এবং তারা আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে।
আয়াতের অর্থ: "লোকেরা যখন তাদেরকে বলেছিল, 'তোমাদের বিরুদ্ধে শত্রু বাহিনী সমবেত হয়েছে সুতরাং তাদেরকে ভয় কর,' তখন এ কথা তাদের ঈমান আরও বৃদ্ধি করে দিয়েছিল এবং তারা বলেছিল, 'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি কতই না চমৎকার কর্মবিধায়ক।"এই আয়াতটিতে মুমিনদের চরম বিপদের মুহূর্তে অবিচল থাকার মূলমন্ত্র "হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি'মাল ওয়াকিল।
পর্যবেক্ষকদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রে এই তেলাওয়াতকে কেউ কেউ প্রতীকীভাবে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, আন্তর্জাতিক চাপ বা নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও তারা নিজেদের স্বাধীন কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে অটল থাকার বার্তা বহন করে। এই আয়াতের মাধ্যমে ইরান ভারতকে বোঝাতে চেয়েছে যে, বাইরের কোনো শক্তির হুমকিতে কান না দিয়ে নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকাই প্রকৃত সাহসিকতা।
সূত্র: ওয়াইওন, দ্য মিডল ইস্ট আই,
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com