ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট কার্যালয়ে এক আবাসিক শিক্ষার্থীকে দেড় ঘণ্টা অবরুদ্ধ রেখে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তবে নির্যাতনকারী প্রভোস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে, উল্টো অভিযুক্তের রুমে তালা ঝুলানোর অভিযোগে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীসহ হল সংসদের সহ-সভাপতি (ভিপি) ও সমাজসেবা সম্পাদককে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
রোববার (২৩ আগস্ট) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং স্বাক্ষরিত পৃথক নোটিশে তাদের এই শোকজ পাঠানো হয়। নোটিশ প্রাপ্তরা হলেন—প্রভোস্টের হেনস্তার শিকার রোবটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম, ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদের ভিপি খন্দকার মো. আবু নাঈম এবং সমাজসেবা সম্পাদক তরিকুল ইসলাম।
প্রভোস্ট কর্তৃক নির্যাতিত শিক্ষার্থী ইব্রাহিমকে পাঠানো নোটিশে বলা হয়, জনাব, আপনি অবগত আছেন যে, গত ১৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলে প্রভোস্ট কক্ষে সংঘটিত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সত্যানুসন্ধানের লক্ষ্যে মাননীয় উপাচার্য কর্তৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উক্ত তদন্ত কমিটির কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। এমতাবস্থায়, গত ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে হল অফিসের মাধ্যমে অবগত হওয়া যায় যে, আপনি ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট কক্ষ তালাবদ্ধ ও সিলগালা করেছেন। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও দেখা গেছে।
এতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি-বিধান ও প্রশাসনিক রীতি অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনুমোদন বা নির্দেশনা ব্যতিরেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রশাসনিক ভবন, অফিস বা কক্ষ তালাবদ্ধ, অবরুদ্ধ কিংবা সিলগালা করার এখতিয়ার কোনো ব্যক্তির নেই। আপনার দ্বারা সংঘটিত উক্ত কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি-বিধানের পরিপন্থী এবং প্রশাসনিকভাবে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এমতাবস্থায়, কোন কর্তৃত্ব, এখতিয়ার বা অনুমোদনের ভিত্তিতে আপনি ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট কক্ষ তালাবদ্ধ ও সিলগালা করেছেন, তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আগামী এক (১) কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে প্রদান করার জন্য আপনাকে জানানো জাচ্ছে। একই সঙ্গে, আপনার বিরুদ্ধে কেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি-বিধান অনুযায়ী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার কারণও উক্ত সময়সীমার মধ্যে লিখিতভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য আপনাকে বলা হলো। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা প্রদান করা না হলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধি-বিধান অনুযায়ী পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
একই ধরনের নোটিশ পাঠানো হয় হল সংসদের ভিপি Khandaker Md Abu Nayeem ও সমাজসেবা সম্পাদক Tarikul Islam কে।
প্রশাসনের এই পদক্ষেপে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও হল সংসদের নেতারা। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম বলেন, "আমি নির্যাতনের বিচার চাইতে গিয়ে উল্টো বিচারের মুখোমুখি হচ্ছি। সিসিটিভি ফুটেজে প্রভোস্টের অপরাধ স্পষ্ট থাকার পরও তাকে বহাল রেখে আমাদের শোকজ করা হয়েছে। আমরা পুরো হল কার্যালয় নয়, কেবল নির্যাতনকারী প্রভোস্টের কক্ষে তালা দিয়েছিলাম। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই নির্যাতনকারী প্রভোস্টের কোনো বিচার না করে বরং দুদিন পর আমাকেই বহিষ্কার করবে।"
ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে হল সংসদের ভিপি Khandaker Md Abu Nayeem বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে যে কারণ দর্শানো (শো কজ) নোটিশ পাঠিয়েছে, আমি তার তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করছি। যেই নির্যাতনকারী প্রভোস্ট দেড় ঘন্টা ধরে আমার ভাইয়ের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে, সেই প্রভোস্টের পদত্যাগ দাবি করায়, তার রুম তালাবদ্ধ করায় ভিক্টিম Md Ibrahim সহ আমাকে ও আমাদের সমাজসেবা সম্পাদক Tarikul Islam কে শোকজ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। স্পষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ থাকা সত্ত্বেও যেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একজন অমানুষ শিক্ষকের বিচার করতে পারেনা সেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে মুখ বন্ধ করতে চাচ্ছে।
এ যেন ফ্যাসিবাদী আমলের প্রশাসনেরই প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই—ভীতি প্রদর্শন বা ফ্যাসিবাদী কায়দায় চাপ প্রয়োগ করে আমাদের ন্যায়সংগত আন্দোলন থামানো যাবে না। যতক্ষণ না পর্যন্ত আমাদের সহপাঠীর সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত হচ্ছে, ততক্ষণ আমাদের এই প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।"
এর আগে গত ১৬ আগস্ট শিক্ষার্থী মো. ইব্রাহিম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেন, প্রভোস্টের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সমালোচনামূলক একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার দেওয়ার অপরাধে তাকে প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুনের কক্ষে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে জোরপূর্বক তার মোবাইল কেড়ে নিয়ে ফোন চেক করা হয় এবং প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সিট বাতিল, উপাচার্যের মাধ্যমে ছাত্রত্ব বাতিল ও সাইবার আইনে মামলার হুমকি দিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে হেনস্তা করা হয়। পরে কর্মচারীদের দিয়ে একটি লিখিত স্বীকারোক্তিতে তাকে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
সার্বিক বিষয়ে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. ইসরাফিল প্রাং জানান, আমরা ইতোমধ্যে অভিযুক্ত শিক্ষককেও নোটিশ পাঠিয়েছি এবং তিনি এর লিখিত জবাবও দিয়েছেন। আমাদের তদন্ত চলমান রয়েছে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে যতটুকু অপরাধের প্রমাণ আমরা পাব তা অনুযায়ী শাস্তির সুপারিশ করব। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকগণ বিধি মোতাবেক তাদের বিরুদ্ধে একশন নিবেন।
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com