ঢাকার যানজট ও সড়কনিরাপত্তার সংকটের সঙ্গে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত বিস্তার এখন সরাসরি সম্পর্কিত। তবে সমস্যার সমাধান কেবল অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া নয়; এর সঙ্গে জড়িত চালক ও মালিকদের জীবিকা, যাত্রীদের সাশ্রয়ী যাতায়াত এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
সাম্প্রতিক সরকারি উদ্যোগে ঢাকার প্রধান সড়কে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-রিকশা বন্ধ এবং অভ্যন্তরীণ সড়কে নিবন্ধিত সর্বোচ্চ চার যাত্রী বহনকারী ই-রিকশা চলাচলের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় প্রকৌশলগত সনদ, ফিটনেস ও নির্দিষ্ট রুটের বিষয়ও রাখা হচ্ছে।
সমস্যাটির আরেকটি বড় দিক বিদ্যুৎ। সাম্প্রতিক একটি CPD-ভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চার্জে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০–৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হচ্ছে; অনেক চার্জিং পয়েন্টে অবৈধ সংযোগের অভিযোগ রয়েছে। একই গবেষণায় অনিয়ন্ত্রিত এই খাতের কারণে বছরে প্রায় ৪,০০০ কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে।
সড়কনিরাপত্তার চিত্রও উদ্বেগজনক। Road Safety Foundation-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকায় ৪০৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২১৯ জন নিহত এবং ৫১১ জন আহত হয়েছেন—অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন একটির বেশি দুর্ঘটনা। জাতীয় পর্যায়ে একই বছরে ৭,৫৮৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৩৫৯ জন নিহত ও ১৬,৪৭৬ জন আহত হয়েছেন—গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২১টি দুর্ঘটনা।
তাহলে সমাধান কী?
প্রথমত, প্রধান সড়কে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা এবং অলিগলিতে নিয়ন্ত্রিত চলাচল—এই দুই স্তরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রতিটি অটোরিকশাকে ডিজিটাল নিবন্ধন, নম্বরপ্লেট, ফিটনেস ও চালকের প্রশিক্ষণ/লাইসেন্সের আওতায় আনতে হবে। অঞ্চলভিত্তিক রুট পারমিট দিলে এক এলাকার অটোরিকশা নির্বিচারে অন্য এলাকায় ঢুকতে পারবে না—এ ধরনের জোনভিত্তিক ব্যবস্থার উদ্যোগও ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।
দ্বিতীয়ত, অবৈধ চার্জিং সম্পূর্ণ বন্ধ করে অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন তৈরি করতে হবে। সেখানে মিটারযুক্ত বিদ্যুৎ, নির্ধারিত ট্যারিফ এবং সম্ভব হলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তৃতীয়ত, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো চালকদের বিকল্প কর্মসংস্থান। প্রধান সড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়া চালকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অনুমোদিত অভ্যন্তরীণ রুটের ই-রিকশা, ডেলিভারি সেবা, পরিবহন সহকারী, কারিগরি কাজ, বৈদ্যুতিক যান রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে যুক্ত করা যেতে পারে। শুধু নিষেধাজ্ঞা দিলে জীবিকার সংকট তৈরি হবে; পুনর্বাসনসহ নিয়ন্ত্রণ করলেই টেকসই সমাধান সম্ভব।
সবশেষে মনে রাখতে হবে—এটি শুধু সরকারের সমস্যা নয়। সরকার, সিটি করপোরেশন, পুলিশ, বিদ্যুৎ বিভাগ, অটোরিকশা মালিক-চালক, যাত্রী এবং সাধারণ নাগরিক—সবার সম্মিলিত সহযোগিতা ছাড়া ঢাকার সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না। সরকারকে কঠোর হতে হবে, কিন্তু সেই কঠোরতার সঙ্গে থাকতে হবে নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, বৈধ চার্জিং ব্যবস্থা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের মানবিক নীতি। তাহলেই অটোরিকশা নির্মূল নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ নগর পরিবহনে রূপান্তর সম্ভব।

E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com