বাংলাদেশে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে, পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, জিপিএর প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন আজও আমাদের সামনে রয়ে গেছে—আমরা কি সত্যিই শিক্ষিত মানুষ তৈরি করছি, নাকি শুধু পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মানুষ তৈরি করছি?
একজন শিক্ষার্থী বছরের পর বছর বই পড়ে, অসংখ্য তথ্য মুখস্থ করে এবং পরীক্ষার খাতায় তা লিখে ভালো ফল করে। কিন্তু বাস্তব জীবনের একটি সমস্যা সমাধান করতে হলে, নিজের চিন্তা দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করতে হলে কিংবা কর্মক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে হলে অনেকেই পিছিয়ে পড়ে। এখানেই বাংলাদেশের শিক্ষা সংস্কারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজনীয়তা।
সময়ের দাবি হলো দেশের বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি মাধ্যম, মাদ্রাসা এবং কারিগরি শিক্ষার ইতিবাচক দিকগুলোকে সমন্বয় করে একটি আধুনিক জাতীয় শিক্ষানীতি তৈরি করা। এজন্য একটি শক্তিশালী ও বাস্তবমুখী জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যেখানে শিক্ষাবিদদের পাশাপাশি শিল্পোদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং শ্রমবাজার বিশেষজ্ঞদের মতামত গুরুত্ব পাবে।
ভবিষ্যতের শিক্ষাব্যবস্থায় মুখস্থবিদ্যার পরিমাণ কমিয়ে শিক্ষার্থীর চিন্তা, যুক্তি, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান এবং সৃজনশীলতাকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে আনতে হবে। পরীক্ষার প্রশ্ন এমন হওয়া উচিত, যার উত্তর শুধু বইয়ের একটি অনুচ্ছেদ মুখস্থ করে দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষার্থী কী বুঝেছে এবং সেই জ্ঞান বাস্তবে কীভাবে ব্যবহার করতে পারে—সেটিই হওয়া উচিত প্রকৃত মূল্যায়নের ভিত্তি।
বাংলা আমাদের পরিচয় ও সংস্কৃতির ভাষা, ইংরেজি আন্তর্জাতিক যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনীতির দিকে তাকালে আরবি ভাষার ব্যবহারিক গুরুত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। ভাষাগত দক্ষতার অভাবে অনেকেই নিজেদের কাজ, অধিকার ও চুক্তির বিষয়গুলো যথাযথভাবে বুঝতে পারেন না এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাশিত সুযোগ থেকে পিছিয়ে পড়েন।
তাই মাদ্রাসার আরবি শিক্ষাকে শুধু ধর্মীয় পাঠের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে অর্থসহ ব্যবহারিক আরবি ভাষা শিক্ষা হিসেবে আরও কার্যকর করা যেতে পারে। কথোপকথন, কর্মক্ষেত্রের ভাষা, দৈনন্দিন যোগাযোগ এবং পেশাগত শব্দভাণ্ডার শেখানো হলে এটি কর্মসংস্থানের একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। এতে ধর্মীয় শিক্ষার মর্যাদা বজায় রেখেই নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে অন্তত একটি বাস্তব দক্ষতা তুলে দেওয়া। কারিগরি শিক্ষা আর আলাদা বা দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা নয়; আধুনিক বিশ্বের অর্থনীতি দক্ষ মানুষের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। স্কুলপর্যায় থেকেই প্রযুক্তি, কম্পিউটার, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, অটোমোবাইল, কৃষি প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্পসহ বিভিন্ন দক্ষতার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করানো প্রয়োজন।
শিক্ষার সঙ্গে খেলাধুলা, অভিনয়, সংগীত, নৃত্য, বিতর্ক, মার্শাল আর্ট, ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো কার্যক্রমও যুক্ত করতে হবে। কারণ একজন মানুষের শিক্ষা শুধু মস্তিষ্কের নয়—তার ব্যক্তিত্ব, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব এবং আত্মবিশ্বাসেরও।
বাংলাদেশের আগামী দিনের শিক্ষা দর্শন হতে পারে—কম মুখস্থ, বেশি চিন্তা; কম সার্টিফিকেট, বেশি দক্ষতা; শুধু চাকরিপ্রার্থী নয়, কর্মক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী নাগরিক।
শিক্ষাব্যবস্থাকে যদি আমরা সত্যিকার অর্থে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ—তার তরুণ জনগোষ্ঠী—একদিন শুধু শ্রমশক্তি নয়, দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে দেশ ও বিশ্বের অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।

E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com