বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়, অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র এবং কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের আশ্রয়স্থল। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই শহর কি সত্যিই তার নাগরিকদের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠছে? নাকি ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং ফুটপাত-সড়ক দখলের কারণে ঢাকা ধীরে ধীরে নাগরিকদের কাছ থেকে তাদের মৌলিক অধিকার কেড়ে নিচ্ছে?
রাজধানীর ফুটপাত মূলত পথচারীর চলাচলের জন্য নির্মিত। অথচ বাস্তবতা হলো, শহরের বহু গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশ আজ হকার ও অস্থায়ী ব্যবসার দখলে। কোথাও কোথাও পথচারীদের হাঁটার জায়গাই নেই। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যস্ত সড়কে নেমে হাঁটে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে, যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং নগরজীবনের স্বাভাবিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে।
ফুটপাত দখলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও ভয়াবহ একটি অস্বচ্ছ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা—চাঁদাবাজি। বিভিন্ন গবেষণা ও প্রতিবেদনে রাজধানীর ফুটপাত হকারদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠে এসেছে। একটি বহুল আলোচিত গবেষণার হিসাবে বছরে প্রায় ৫০ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে । এই অর্থ রাষ্ট্রের রাজস্ব খাতে না গিয়ে বিভিন্ন অনিয়ন্ত্রিত চক্রের হাতে চলে যাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। একজন বৈধ ব্যবসায়ী দোকান ভাড়া দেন, ট্রেড লাইসেন্স করেন, বিদ্যুৎ বিল দেন, কর্মচারীর বেতন দেন এবং ভ্যাট-ট্যাক্সসহ রাষ্ট্রের নানা নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনা করেন। অথচ ফুটপাত দখল করে পরিচালিত অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার ক্ষেত্রে একই ধরনের ব্যয় ও জবাবদিহি অনেক সময় থাকে না। ফলে তৈরি হয় অসম প্রতিযোগিতা। যারা আইন মেনে ব্যবসা করছেন, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও বৈধ দোকানদার ও ফুটপাতের ব্যবসার মধ্যে এই বৈষম্যের প্রশ্নটি সামনে এসেছে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভোক্তার অধিকার। অনিবন্ধিত ও দুর্বল তদারকির আওতায় থাকা ব্যবসায় পণ্যের উৎস, মান এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। একই ধরনের দেখতে নিম্নমানের বা অননুমোদিত পণ্য বাজারে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এতে সাধারণ মানুষ যেমন প্রতারিত হতে পারেন, তেমনি বৈধ উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
তবে হকারমুক্ত ঢাকা মানে কোনোভাবেই মানুষকে বেকার করে দেওয়া নয়। সেটি অমানবিক এবং কোনো টেকসই সমাধানও নয়। প্রকৃত সমাধান হলো—ফুটপাত পথচারীর জন্য মুক্ত রাখা এবং হকারদের পরিকল্পিত, নিবন্ধিত ও নির্ধারিত ব্যবসায়িক ব্যবস্থার মধ্যে আনা।
সরকারের সাম্প্রতিক ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬ সেই দিকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। নীতিমালায় নিবন্ধন, নির্ধারিত স্থান ও সময়, নৈশকালীন ও হলিডে মার্কেট এবং পথচারীদের চলাচলের জায়গা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। মূল সড়কে হকার বসতে না দেওয়া এবং নির্দিষ্ট শর্তে ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ একটি আধুনিক নগরব্যবস্থার দিকেই ইঙ্গিত করে।
ঢাকার সমস্যা শুধু হকার নয়; এর পেছনে রয়েছে ভয়াবহ ঢাকামুখী জনস্রোত। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, গ্রাম ও ছোট শহরে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় মানুষ জীবিকার সন্ধানে রাজধানীতে আসছে। কৃষি, স্থানীয় শিল্প এবং জেলা শহরের অর্থনীতি শক্তিশালী না হলে এই প্রবণতা থামানো যাবে না। একটি দেশের সব মানুষ যদি জীবিকার জন্য একটি শহরমুখী হয়, তাহলে সেই চাপ কোনো রাজধানীর পক্ষেই দীর্ঘদিন বহন করা সম্ভব নয়।
তাই প্রয়োজন দ্বিমুখী পদক্ষেপ—একদিকে ঢাকার ফুটপাত ও জনপরিসরকে দখলমুক্ত করা, অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করা।
ঢাকা আধুনিক হবে শুধু উড়ালসড়ক, মেট্রোরেল বা বহুতল ভবনের কারণে নয়। একটি শহরের আধুনিকতার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সেখানে একজন শিশু, একজন নারী, একজন বৃদ্ধ কিংবা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিরাপদে ফুটপাতে চলতে পারেন কি না।
এখন সময় এসেছে কঠোর কিন্তু মানবিক সিদ্ধান্তের।
ফুটপাত থাকবে পথচারীর জন্য। ব্যবসা হবে নির্ধারিত স্থানে। হকারের জীবিকা থাকবে সুরক্ষিত, কিন্তু নাগরিকের চলাচলের অধিকারও থাকবে অক্ষুণ্ণ।
এটাই হতে পারে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ এবং সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য ঢাকার নতুন সামাজিক চুক্তি।
ফুটপাত কারও দয়া নয়—এটি জনগণের অধিকার।
সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার সময় এখনই।

E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com