ইয়েমেনের কৌশলগত মোখা বন্দর দখলের পর লোহিত সাগরের উপকূল ধরে বাব আল-মান্দেব প্রণালির দিকে অগ্রসর হচ্ছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা। হানিশ দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত তাদের অগ্রযাত্রায় বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিরাপত্তা এবং সউদী আরবের তেল রপ্তানি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সামরিক সূত্র জানিয়েছে, হুতিরা মোখা দখলের পর হানিশ দ্বীপপুঞ্জের দিকে অগ্রসর হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বাহিনী ও তাদের মিত্ররা দক্ষিণে ধুবাবের দিকে সরে যাচ্ছে। বাব আল-মান্দেব প্রণালির বিপরীতে অবস্থিত পেরিম দ্বীপের কাছের এই এলাকাটি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রণালিটির ওপর প্রভাব বিস্তারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বাব আল-মান্দেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ এটি। ফলে প্রণালিটির নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
জাতিসংঘের ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ বলেছেন, মোখা দখলের মধ্য দিয়ে হুতিরা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের প্রবেশমুখে সরাসরি উপস্থিতি তৈরি করেছে। তিনি পরিস্থিতিকে ইয়েমেন সংঘাতের ‘নতুন ও আরও বিপজ্জনক পর্যায়’ হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বাব আল-মান্দেব এখনো পুরোপুরি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যায়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধুবাব ও পেরিম দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলেই প্রণালিটির ওপর আরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ মোখা দখল হুতিদের কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করলেও প্রণালিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো অর্জিত হয়নি।
হুতিদের নিয়ন্ত্রিত মানবিক কার্যক্রম সমন্বয় কেন্দ্র জানিয়েছে, সউদী জাহাজ ছাড়া লোহিত সাগরে অন্য বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল নিরাপদ রয়েছে। হুতি মুখপাত্র মোহাম্মদ আবদুস সালামও বলেছেন, তাদের সামরিক অভিযান নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক এবং ইয়েমেনের ওপর হামলা বন্ধ হলে তা থামবে।
এদিকে সউদী আরবের জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় সউদী আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে তেল রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভর করছে। ফলে বাব আল-মান্দেবে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে সৌদির তেল সরবরাহ ও রপ্তানিতে বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
পাকিস্তানের মাধ্যমে সউদী আরব ইরানকে হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে সতর্ক করেছে বলেও জানা গেছে। তেহরান অবশ্য হুতিদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সময়ে ইয়েমেনের সরকারি, ইরানি ও আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হুতি অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের নির্দেশনা ছিল।
হুতিদের মোখা দখলের খবরে আন্তর্জাতিক বাজারেও তেলের দাম বেড়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম একপর্যায়ে ১০৫ ডলারের ওপরে উঠে যায়। এর আগে হরমুজ ও লোহিত সাগর—দুই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথেই সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়ছিল।
মোখা দখল হুতিদের লোহিত সাগর উপকূলে কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করেছে এবং তাদের বাব আল-মান্দেবের আরও কাছে নিয়ে গেছে। তবে প্রণালিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এখনো তাদের হাতে যায়নি। এই অবস্থায় হুতিদের পরবর্তী অগ্রযাত্রা ইয়েমেন সংঘাতের পাশাপাশি সউদী তেল রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। তথ্যসূত্র: রয়টার্স
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com