* একদিনে হাম-ডেঙ্গু কাড়ল শিশুসহ আরও ৯ প্রাণ
* হামে মৃত্যু বেড়ে ১০২২, একদিনে আক্রান্ত ৯৬৮
* এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মৃত্যু বেড়ে ১৩৯, একদিনে আক্রান্ত ১৪৯২
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। একই সঙ্গে পাল্ল দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন স্থানে হাম ও হামের উপসর্গে এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে কেউ না কেউ নতুন করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন। প্রনিনিয়তই হাম ও হামের উপসর্গের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ছুটছে প্রাণঘাতী ডেঙ্গুর প্রকোপ। প্রতিদিনই প্রাণঘাতী এ দুটি রোগে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ ও ডেঙ্গু কাড়ল ৩ শিশুসহ ৯ জনের প্রাণ। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৩ শিশু ও ডেঙ্গুজ্বরে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১০২২ জনে দাঁড়িয়েছে। এদের সবাই শিশু। গত ২৪ ঘন্টায় প্রাণঘাতী এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে ৯৬৮ জন। অপরদিকে চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গেুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া একদিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৫৬১ জন। রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম ও ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত পৃথক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। রোগী ও স্বজনরা বলছেন, হাম ও ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নেই তদারকি, হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা নেই। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের মতে, জনসচেতনতার অভাবে হাম ও হামের উপসর্গ এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এ দুটি রোগের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা উচিৎ। শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা মনিটরিং করা জরুরি। তবে ডেঙ্গুর বিস্তার ঠেকাতে জনগণকে সম্পৃক্ত করে দেশজুড়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারে সংশ্লিষ্টদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিনই ভিড় করছে হাম ও হামের উপসর্গ এবং ডেঙ্গু আক্রান্ত শত শত কোমলমতি শিশুসহ নানা বয়সের মানুষ। এসব রোগ থেকে বাঁচাতে দেশের সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রোগী নিয়ে ছুঁটছেন রোগীর স্বজন ও অভিভাবকরা।
ভুক্তভোগী রোগী ও বলছেন, হামের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের পরিকল্পনায় যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা ও যথাযথ চিকিৎসা সেবা নেই।
শিশু রোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এর প্রধান লক্ষণ হলো উচ্চ জ্বর, সর্দি, কাশি, লাল ও পানিযুক্ত চোখ এবং মুখ ও গলার ভেতরে ছোট সাদা দাগ ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি বা র্যাশ ছড়িয়ে পড়ে। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তৃণমূলে শিশু স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
জনস্বাস্থ্য বিষেশজ্ঞ বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ আল-মামুনের মতে, জনসচেতনতার অভাবে হাম ও হামের উপসর্গ এবং এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। এ দুটি রোগের লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বা নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করা উচিৎ। তিনি বলেন, অবহেলা করলেই বিপদ আরও বাড়বে। শহর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা মনিটরিং করা জরুরি।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাম-বিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশজুড়ে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট মৃত্যু ১ হাজার ২২ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে নতুন করে ৯৬৮ জনের শরীরে হাম ও এর উপসর্গ দেখা গেছে। এ তথ্য জানানো হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে শুধু ঢাকা বিভাগেই ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে চট্টগ্রাম বিভাগে হামের উপসর্গে আরও একজনের প্রাণহানি হয়েছে। তাদের নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ১ হাজার ২২ জনের প্রাণহানি হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গে ৯২২ জন ও হামে আক্রান্ত হয়ে ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৬৩ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে। পাশাপাশি এই সময়ে আরও ৯০৫ জনের মধ্যে রোগটির উপসর্গ দেখা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৪৩ জনের শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। সেই সঙ্গে এই সময়ে মোট ২০ হাজার ৬৯ জনের হাম শনাক্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে রোববার পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ১ লাখ ৫১ হাজার ২৪ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে এ পর্যন্ত সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৫২ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন।
অন্যদিকে, একইদিনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু-বিষয়ক নিয়মিত আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে চলতি বছর মশাবাহিত রোগটিতে এ পর্যন্ত মোট প্রাণহানি ১৪৯ জনে দাঁড়াল। এ ছাড়া গত একদিনে ডেঙ্গু নিয়ে নতুন করে ১ হাজার ৫৬১ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, গত একদিনে খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে ডেঙ্গুতে দুইজন করে মোট ৪ জন মারা গেছেন। পাশাপাশি এই সময়ে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে ডেঙ্গুতে একজন করে আরও ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৩০৭ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এ ছাড়াও উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ২৭৫ জন ছাড়াও বরিশাল বিভাগে ২০২, চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮১, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭৬, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ১৪৪, রাজশাহী বিভাগে ১০৪, ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৩, রংপুর বিভাগে ৭৩ ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গু নিয়ে ৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে ডেঙ্গুতে ৩৬ জন মারা গেছেন। এর পরের মাস আগস্টে ৪৩ জন এবং চলতি সেপ্টেম্বরের ১৩ দিনেই ডেঙ্গুতে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। সবমিলিয়ে চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট ১৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে দুই সিটি করপোরেশনসহ শুধু ঢাকা বিভাগেই ডেঙ্গুতে ৭৫ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া উল্লেখিত সময়ে খুলনা বিভাগে ২৭ জন ছাড়াও ময়মনসিংহ বিভাগে ১৫, বরিশাল বিভাগে ১২, চট্টগ্রাম বিভাগে ১২, রাজশাহী বিভাগে ৬ জন এবং রংপুর ও সিলেট বিভাগে ডেঙ্গুতে একজন করে মোট ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com