আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে নির্মম সত্য—রাষ্ট্রের কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই, নেই চিরস্থায়ী শত্রুও। চিরস্থায়ী যা, তা হলো জাতীয় স্বার্থ।
ইতিহাসের পাতায় বন্ধুত্বের যত শপথ, কূটনীতির টেবিলে তার চেয়েও বেশি লেখা আছে স্বার্থের হিসাব। আজ যে দেশকে প্রতিপক্ষ বলা হচ্ছে, কাল তার সঙ্গেই হাত মেলাতে হতে পারে। আবার যে রাষ্ট্রকে মিত্র বলা হচ্ছে, স্বার্থের সমীকরণ বদলে গেলে তার বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হতে পারে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি তাই আবেগের নয়, মূলত ক্ষমতা, অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও ভূরাজনৈতিক হিসাবের খেলা।
ভারত ও চীনের সম্পর্কই এর বড় উদাহরণ। হিমালয় সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে; ২০২০ সালের গালওয়ান সংঘর্ষের পর সম্পর্ক ভয়াবহভাবে অবনতি হয়েছিল। ভারত চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছিল, সীমান্তে সামরিক উপস্থিতিও জোরদার করেছিল। কিন্তু কয়েক বছর পর সেই একই দুই দেশ আবার সংলাপের টেবিলে ফিরেছে। সীমান্তে বিরোধ রয়ে গেলেও বাণিজ্য থেমে থাকেনি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীন ভারতের সবচেয়ে বড় আমদানি-উৎসে পরিণত হয়েছে; দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
আরও বিস্ময়কর হলো, ভারত ও চীন একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্কও বজায় রাখছে। অর্থাৎ দিল্লি যেমন ওয়াশিংটনের কৌশলগত অংশীদার, তেমনই বেইজিংয়ের সঙ্গেও বাণিজ্যিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ করছে না। কারণ রাষ্ট্র জানে—একটি দরজা বন্ধ করে দিলে অন্য দরজাটিও হয়তো একদিন প্রয়োজন হয়ে পড়বে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের উপস্থিতি সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে। ভারত-চীন সীমান্তে অবিশ্বাস থাকলেও একই মঞ্চে তারা অর্থনীতি, প্রযুক্তি, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও উন্নয়নশীল বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করছে। ব্রিকস এখন বিশ্বের প্রায় ২৮ শতাংশ জিডিপির প্রতিনিধিত্ব করে। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সহযোগিতা—দুটিই একই সঙ্গে চলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের চিত্র আরও নাটকীয়। সৌদি আরব ও ইসরায়েলের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কিন্তু আঞ্চলিক নিরাপত্তা, ইরানের প্রভাব, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে তাদের স্বার্থের কিছু জায়গায় মিল তৈরি হয়েছে। তবে এটিকে সরলভাবে “সৌদি-ইসরায়েল জোট” বলা এখনও সঠিক নয়। বরং বলা যায়—পুরোনো শত্রুতার পাশাপাশি নতুন নিরাপত্তা-সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ সালের সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরব নিজস্ব নিরাপত্তা রক্ষায় আগের তুলনায় আরও সক্রিয় হয়েছে; এমনকি ইরানের বিরুদ্ধে সৌদি অবস্থানও কঠোর হয়েছে।
এখানেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির আসল শিক্ষা: শত্রুতাও পরিস্থিতিনির্ভর, বন্ধুত্বও পরিস্থিতিনির্ভর।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা তার পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় জ্বালানি সরবরাহ সংকট তৈরি হলে ঢাকা রাশিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা-ছাড় চেয়েছে। বাংলাদেশের প্রস্তাব ছিল সর্বোচ্চ ছয় লাখ টন রুশ ডিজেল আমদানির সুযোগ। একই সময়ে বাংলাদেশ ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, উজবেকিস্তান, কাজাখস্তান, অ্যাঙ্গোলা ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করেছে।
এই ঘটনাটি একটি গভীর বাস্তবতা সামনে আনে—ছোট বা মাঝারি কোনো রাষ্ট্রের জন্য পররাষ্ট্রনীতি কেবল আদর্শের প্রশ্ন নয়; সেখানে জ্বালানি, খাদ্য, বৈদেশিক মুদ্রা, বাণিজ্য, নিরাপত্তা এবং ভূরাজনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে।
আজ রাশিয়া ও চীন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে একে অন্যের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আবার ভারত রাশিয়া থেকে জ্বালানি কিনছে, একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে একদিকে ইরান-সৌদি বিরোধ কমানোর চেষ্টা হয়েছে চীনের মধ্যস্থতায়, অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এখনও গুরুত্বপূর্ণ।
তাহলে শেষ পর্যন্ত পৃথিবী চলে কীসে?
বন্ধুত্বে? আদর্শে? নাকি শত্রুতায়?
সম্ভবত কোনোটিতেই এককভাবে নয়। পৃথিবী চলে ক্ষমতা, অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং স্বার্থের সমীকরণে।
তাই আন্তর্জাতিক রাজনীতির অভিধানে ‘বন্ধু’ ও ‘শত্রু’ শব্দ দুটির মেয়াদ অনেক সময় খুবই ছোট। আজকের প্রতিপক্ষ আগামী দিনের আলোচনার অংশীদার হতে পারে, আর আজকের মিত্র আগামী দিনের দর-কষাকষির প্রতিপক্ষ।
রাষ্ট্রগুলো আবেগে ইতিহাস মনে রাখে, কিন্তু সিদ্ধান্ত নেয় ভবিষ্যতের হিসাব কষে।
আর সেই কারণেই কূটনীতির সবচেয়ে পুরোনো সত্য আজও অমলিন—
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্ধু বলে কেউ নেই, চিরস্থায়ী শত্রুও নেই। চিরস্থায়ী হলো শুধু জাতীয় স্বার্থ বেচা কেনা।

E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com