একদিন হয়তো আমরা দেখব—প্রেক্ষাগৃহ আছে, কিন্তু নতুন সিনেমা নেই। শুটিংয়ের আলো আছে, কিন্তু ক্যামেরার সামনে কোনো শিল্পী নেই। ক্যামেরা আছে, কিন্তু ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির হাতে কাজ নেই। আর সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যটি হবে—একটি দেশের সংস্কৃতি ধীরে ধীরে নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে, অথচ আমরা সবাই নীরবে তাকিয়ে আছি।
আজ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও নাট্যাঙ্গনের বাস্তবতা আমাকে গভীরভাবে ভাবাচ্ছে। ঈদকে কেন্দ্র করে কয়েকটি সিনেমা মুক্তি পেলেও ঈদের পর নিয়মিত চলচ্চিত্র নির্মাণ ও মুক্তির ধারাবাহিকতা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি-দুটি সিনেমা মুক্তি পেলেই একটি শিল্প বেঁচে থাকে না; শিল্প বাঁচে নিয়মিত কাজ, বিনিয়োগ, দর্শক, প্রেক্ষাগৃহ এবং মানুষের আস্থার ওপর।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে শিল্পীদের পাশাপাশি সেই মানুষগুলোর জীবনে, যাদের আমরা সাধারণত পর্দায় দেখি না। ক্যামেরাম্যান, চিত্রগ্রাহক, আলো কর্মী, শব্দগ্রাহক, সম্পাদনাকর্মী, মেকআপশিল্পী, সেটকর্মী, সহকারী পরিচালক, পোশাককর্মী, পরিবহনকর্মী—অসংখ্য মানুষের সংসার চলচ্চিত্র ও নাটকের কাজের ওপর নির্ভরশীল। একটি শুটিং বন্ধ হওয়া মানে শুধু একজন অভিনেতার কাজ বন্ধ হওয়া নয়; এর সঙ্গে বহু পরিবারের আয়ও থেমে যাওয়া।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিচালক, শিল্পী, প্রযোজক, পরিবেশক ও কারিগরি কর্মীদের একাধিক সংগঠন রয়েছে। চলচ্চিত্র পরিবারের বিভিন্ন সংগঠনকে নিয়ে অতীতে ১৮ ও পরে ১৯টি সংগঠনের সম্মিলিত প্ল্যাটফর্মের কথাও এসেছে। প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ১৪০ জন। অন্যদিকে পরিচালক সমিতির সদস্যসংখ্যা পাঁচ শতাধিক; ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে চার শতাধিক পরিচালক নিয়মিত কাজ না পাওয়ার কথা উঠে এসেছিল।
নাট্যাঙ্গনের চিত্রও খুব আলাদা নয়। পরিচালকদের সংগঠনের ২০২৫ সালের নির্বাচনে ৫০১ জন ভোটারের তথ্য পাওয়া যায়। অভিনয়শিল্পী সংঘের সদস্যসংখ্যাও এক হাজারের বেশি। এর বাইরে ক্যামেরা, সম্পাদনা, আলো, শব্দ, মেকআপ, সেট, পোশাক ও শুটিং-সংশ্লিষ্ট অসংখ্য মানুষ এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। তাদের সবার কর্মসংস্থানের সঠিক সম্মিলিত সংখ্যা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয় না। কিন্তু কাজের সংকট যে একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকাকে প্রভাবিত করছে, সেটি শিল্পাঙ্গনের বাস্তব অভিজ্ঞতায় স্পষ্ট।
আরেকটি বিষয় আমাদের আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। সাম্প্রতিক সময়ে মাজার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন পরিসরে হামলা, বাধা বা চাপের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনা শুধু কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত নয়; এগুলো আমাদের বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের কারণ। অথচ বুদ্ধিজীবী সমাজ, সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং নীতিনির্ধারকদের কাছ থেকে এ বিষয়ে আরও জোরালো ও ধারাবাহিক আলোচনা প্রত্যাশিত।
আমি কোনো রাজনৈতিক পক্ষের হয়ে কথা বলছি না। আমি একজন চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে আমার মনের কথাটুকুই বলতে চাই—শিল্পকে বাঁচাতে হলে শিল্পীকে বাঁচাতে হবে, আর শিল্পীকে বাঁচাতে হলে শিল্পের অর্থনীতি ও নিরাপদ পরিবেশকে বাঁচাতে হবে।
প্রয়োজন চলচ্চিত্র ও নাটকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনা। প্রয়োজন নতুন বিনিয়োগ, সহজ অর্থায়ন, কর-সুবিধা, নিয়মিত প্রেক্ষাগৃহ, সরকারি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং শিল্পী-কলাকুশলীদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা। প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে একজন শিল্পী তার মত, সৃজনশীলতা ও সংস্কৃতিকে ভয় ছাড়া প্রকাশ করতে পারেন।
কারণ সংস্কৃতি কোনো বিলাসিতা নয়। সংস্কৃতি একটি জাতির স্মৃতি, পরিচয় ও আত্মার ভাষা।
একটি দেশ তার ভূখণ্ড দিয়ে রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু তার সংস্কৃতি দিয়েই সে নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করে। তাই সংস্কৃতি যদি দুর্বল হয়ে যায়, স্বাধীনতার অর্থও ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে যায়।
সংস্কৃতি ছাড়া স্বাধীনতা মূল্যহীন।
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com