রাজধানীর উত্তর শাহজাহানপুরে মোহাম্মদ ফকরুল হাসান ফরহাদ (৪৪) নামের এক ব্যক্তিকে নিজ বাসায় গলা কেটে হত্যার রোমহর্ষক ঘটনার রহস্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। পারিবারিক সম্পত্তি ও বাসার দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণ মিলেছে। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়৷
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে নিহতের আপন বড় বোন নুর আফসানা নিপা (৪৫) ও ভগ্নিপতি আব্দুস সামাদ সুজন (৫৮)-কে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) শাহজাহানপুর থানা পুলিশ৷ গ্রেফতারকৃত দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে বিজ্ঞ আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিন দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন৷
পুলিশ ও মামলার বিবরণ সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার সন্ধ্যা আনুমানিক সাড়ে ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৯টার মধ্যবর্তী সময়ে উত্তর শাহজাহানপুরের একটি বাসায় মোহাম্মদ ফকরুল হাসান ফরহাদকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যা করা হয়। রাত আনুমানিক সাড়ে ৯টার দিকে নিহতের স্ত্রী বাইরে থেকে বাসায় ফিরে দেখেন ঘরের মেঝেতে ফরহাদের নিথর দেহ পড়ে রয়েছে৷
স্বামীর গলাকাটা মরদেহ দেখে স্ত্রী চিৎকার শুরু করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে শাহজাহানপুর থানা পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। খবর পেয়ে থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সুরতহালসহ প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু করে। পরবর্তীতে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করে৷
হত্যাকাণ্ডের পরপরই অপরাধীকে শনাক্ত করতে শাহজাহানপুর থানা পুলিশ আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে গভীর বিশ্লেষণ শুরু করে। ফুটেজ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঘটনার সময় লাল রঙের হেলমেট পরিহিত এক ব্যক্তি ঘটনাস্থল সংলগ্ন এলাকায় অত্যন্ত সন্দেহজনকভাবে চলাফেরা করছেন৷ এরপর প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় ওই ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা হয়।
চিহ্নিত তথ্যের ভিত্তিতে শাহজাহানপুর থানা পুলিশের একটি দল রাজধানীর তোপখানা রোডের একটি অফিসে অভিযান চালিয়ে নিহতের ভগ্নিপতি আব্দুস সামাদ সুজনকে গ্রেফতার করে। পরবর্তীতে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে হত্যাকাণ্ডের সময় পরিহিত সেই লাল রঙের হেলমেট, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ধারালো চাপাতি এবং ঘটনার সময় তার গায়ে থাকা পোশাক উদ্ধার করা হয়৷ তবে আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে পোশাকটি ধোয়া অবস্থায় পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে পুলিশ৷
হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণ নিশ্চিত করতে ঘটনাস্থল থেকে রক্তের নমুনা, হাতের নখের সোয়াব, মোবাইল ফোন এবং ফেলে দেওয়া সিগারেটের বাটসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশ। উদ্ধারকৃত এসব আলামত প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হচ্ছে।
কী কারণে আপন ভাইকে এভাবে গলা কেটে হত্যা করা হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ জানায়, উত্তর শাহজাহানপুরের ওই বাসাটির দখল, বসবাস এবং নিয়মিত গ্যাস ও পানির বিল পরিশোধ করা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিহত ফরহাদের সঙ্গে তার বড় বোন নুর আফসানা নিপা ও ভগ্নিপতি আব্দুস সামাদ সুজনের বিরোধ চলে আসছিল৷ এছাড়া তাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধও ছিল। প্রাথমিক তদন্তে এসব পারিবারিক কলহ ও বিরোধকেই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ বলে ধারণা করছে পুলিশ।
ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোঃ আকতার হোসেন জানান, এ ঘটনায় শাহজাহানপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে৷
তিনি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং উদ্ধারকৃত আলামত বিশ্লেষণের পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ফরেনসিক পরীক্ষার প্রতিবেদন এবং রিমান্ডে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের পর হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত পরিকল্পনা ও প্রত্যেকের ভূমিকা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে৷
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com