সন্তানের মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন মা নাজমা বেগম। চোখে তার একরাশ স্বপ্ন, মনে হাজারও শঙ্কা। যে ছেলের মুখে একসময় মা ডাক শুনে বুকটা ভরে উঠত, সেই ছেলে আজ কথা বলতে পারে না। গলার ক্যান্সার কেড়ে নিয়েছে তার কণ্ঠ। তবুও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে বুকভরা আশা নিয়ে দিন পার করছেন তিনি। যদি কোনো সহৃদয় মানুষ এগিয়ে আসেন, যদি আবার চিকিৎসা শুরু করা যায়, যদি ছেলেটি একদিন সুস্থ হয়ে আগের মতো মাকে ডেকে ওঠে!
কিন্তু বাস্তবতা বড় নির্মম। ছেলের চিকিৎসার খরচ জোগাড় করার সামর্থ্য নেই পরিবারের। একদিকে সন্তানের অসহ্য যন্ত্রণা, অন্যদিকে অর্থের অভাবে চিকিৎসা করাতে না পারার অসহায়ত্ব—দুইয়ের ভার বয়ে চলেছেন মা নাজমা বেগম।
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমর উদ্দিন হাজী বাড়ির বাসিন্দা সাইফুল ইসলামের বড় ছেলে মো. শরিফ। বয়স মাত্র ২৪ বছর। যে বয়সে স্বপ্ন দেখার কথা, পরিবারকে ভালো রাখার কথা, সেই বয়সেই দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে জীবনসংগ্রামে নেমেছেন তিনি। বর্তমানে গলার ক্যান্সারে আক্রান্ত শরিফ কথা বলার ক্ষমতা হারিয়েছেন। একসময় পরিবারের সঙ্গে হাসি-আনন্দে কথা বলতেন, নিজের স্বপ্নের কথা জানাতেন। আজ সেই কণ্ঠ নীরব। চোখেমুখে ফুটে ওঠে অসহায়ত্ব আর যন্ত্রণার ছাপ।
পরিবারের বড় ছেলে শরিফের কাঁধেই ছিল সংসারের দায়িত্ব। তার আয়েই চলত পরিবারের অনেক প্রয়োজন। ছোট ভাই ও বোনকে নিয়ে পরিবারের স্বপ্নগুলোও আবর্তিত হতো তাকে ঘিরে। সেই স্বপ্ন পূরণের আশায় চার-পাঁচ বছর আগে ধারদেনা করে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন তিনি। পরিবারের অভাব ঘোচাবেন, স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাবেন—এমন প্রত্যাশাই ছিল তার।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, বিদেশে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন শরিফ। দুই বছরও থাকতে পারেননি সেখানে। পরিবারের স্বপ্ন পূরণের আগেই অসুস্থ শরীর নিয়ে দেশে ফিরতে হয় তাকে। এরপর ধীরে ধীরে ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে থমকে যায় তার স্বাভাবিক জীবন।
শরিফের বাবা সাইফুল ইসলাম একসময় সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। কিন্তু দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এখন আর আগের মতো গাড়ি চালাতে পারেন না। যে ছেলেটি ছিল পরিবারের একমাত্র উপার্জনের ভরসা, আজ সেই ছেলেই অন্যের সহযোগিতার অপেক্ষায়। অথচ অর্থাভাবে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
সন্তানের অসুস্থতা কোনো মায়ের কাছেই সহজে মেনে নেওয়ার বিষয় নয়। আর সেই সন্তান যখন নিজের কষ্টের কথাটুকুও মুখে বলতে পারে না, তখন মায়ের বুকের ভেতর জমে থাকা যন্ত্রণা ভাষায় প্রকাশ করাও কঠিন। নাজমা বেগমের দিন কাটে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে। কখনো চিকিৎসার আশায়, কখনো ছেলের সুস্থ হয়ে ওঠার স্বপ্নে।
তার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। ছেলের চিকিৎসাটা যেন আবার শুরু করা যায়। শরিফ যেন সুস্থ হয়ে ফিরে পান স্বাভাবিক জীবন, মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, আবার ঘরে ফিরে আসে সেই চেনা কণ্ঠ। কিন্তু সেই আশার পথে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থসংকট।
স্থানীয় বাসিন্দা যুবদল নেতা মাহবুব হোসেন ফাহিম বলেন, শরিফের অসুস্থতার খবর আমরা কয়েক দিন আগে জানতে পেরেছি। এরপরও সাধ্যমতো প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বর্তমানে তার যে শারীরিক অবস্থা, তাতে চিকিৎসার জন্য অনেক টাকার প্রয়োজন। সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। তা না হলে অর্থাভাবে ছেলেটিকে হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
একই ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও শরিফের প্রতিবেশী আবুল বাশার বলেন, ছেলেটি চার-পাঁচ বছর আগে ধারদেনা করে বিদেশে গিয়েছিল। কিন্তু অসুস্থ হয়ে ফিরে আসায় সেখানে দুই বছরও থাকতে পারেনি। তার বাবা সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। তিনিও দুর্ঘটনার শিকার হয়ে এখন আর গাড়ি চালাতে পারেন না। ছেলেটিই ছিল পরিবারের একমাত্র ভরসা। আজ সে নিজেও অসুস্থ, অথচ টাকার অভাবে তার চিকিৎসা করানো সম্ভব হচ্ছে না।
শরিফের পরিবার এখন সমাজের বিত্তবান, প্রবাসী, জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন এবং দেশ-বিদেশে থাকা হৃদয়বান মানুষের সহযোগিতা কামনা করছে। আপনাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোট-বড় যেকোনো সহায়তা তার চিকিৎসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সম্মিলিত সহযোগিতায় হয়তো আবারও চিকিৎসার সুযোগ তৈরি হবে, ফিরে আসবে বেঁচে থাকার নতুন আশা।
একজন মায়ের কাছে সন্তানের সুস্থতার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে? নাজমা বেগমেরও চাওয়া একটাই—ছেলেটি সুস্থ হয়ে আবার তাকে মা বলে ডাকুক। সেই ডাক শোনার আশাতেই আজও ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন তিনি।
হয়তো আপনার সামান্য সহযোগিতাই শরিফের চিকিৎসার পথ খুলে দিতে পারে। আপনার সহায়তা, পরিচিতজনদের কাছে খবরটি পৌঁছে দেওয়া কিংবা মানবিক উদ্যোগে পাশে দাঁড়ানো—যেকোনোভাবেই এগিয়ে আসতে পারেন। একটি পরিবারের নিভে যেতে বসা আশার আলো জ্বালাতে আসুন, শরিফের পাশে দাঁড়াই।
E-mail:dailysamadhan24@gmail.com
© 2026 সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত | DailySamadhan.com