
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি এবং বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, দিল্লির সঙ্গে আঁতাতের কারণেই আওয়ামী লীগ মিছিল করার সুযোগ পাচ্ছে কি না—এ প্রশ্নের জবাব জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত একটি দল কীভাবে সারা দেশে মিছিল-মিটিং করার সুযোগ পাচ্ছে, সেটিও জনগণের প্রশ্ন।
শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৩টায় ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের উদ্যোগে ‘রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রমনীতি : শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় অনন্য আদর্শ’ শীর্ষক জাতীয় সিরাত সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।
সেমিনারে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মানবিক ও কল্যাণমুখী নীতিমালা শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অনন্য আদর্শ। মালিক ও শ্রমিক উভয়েই যদি তাঁর নীতি অনুসরণ করেন, তাহলে সমাজে ন্যায়, সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
তিনি বলেন, একজন প্রকৃত নেতার মধ্যে সহমর্মিতা, সহনশীলতা, বিনয় ও দায়িত্বশীলতা থাকা প্রয়োজন। সমাজ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শ্রেণিসংগ্রামকে পদ্ধতি হিসেবে গ্রহণের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
তিনি আরও বলেন, কারখানা বন্ধ, রেড-ফ্ল্যাগ রাজনীতি এবং শ্রেণিসংগ্রাম ও সমাজতন্ত্র নাস্তিক্যবাদী মতাদর্শের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল। শ্রমিক নেতাদের কেউ কেউ ট্রেড ইউনিয়নকে সমাজতন্ত্রের ‘স্কুল’ হিসেবে ব্যবহার করেছেন এবং ধর্মবিরোধী স্লোগান দিয়েছেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামী নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই ১৯৬৮ সালে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন প্রতিষ্ঠিত হয়। মহানবী (সা.)-এর শ্রমনীতি বাস্তবায়ন ছাড়া শ্রমিকদের প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। ইসলাম মালিক ও শ্রমিককে ভাই হিসেবে বিবেচনা করে। মালিককে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে শ্রমিককে দায়িত্বশীল, সৎ ও আমানতদার হতে হবে।
তিনি বলেন, শ্রমিককে শুধু উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। তার পরিবার, জীবিকা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে। প্রতিষ্ঠানের সুবিধা ও লাভে শ্রমিকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করতে হবে। ইসলামী শ্রমনীতির লক্ষ্য কোনো সংঘাত সৃষ্টি করা নয়; বরং ন্যায় ও দায়িত্বশীলতার ভিত্তিতে শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা।
সেমিনারে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিও জানানো হয়। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জুলাই সনদ গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট আয়োজন করতে হবে। জনগণের মতামত অগ্রাহ্য করে এবং জুলাইয়ের চেতনাকে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তা জুলাই বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা হবে।
তিনি বলেন, জনগণ ফ্যাসিবাদী রাজনীতির পুনরাবৃত্তি চায় না। জুলাই সনদে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে পুরোনো রাজনৈতিক ধারায় ফিরে যাওয়ার কোনো চেষ্টা করা যাবে না। মদিনার সনদের কথা বলে আবার কোরআন-সুন্নাহবিরোধী আইন প্রণয়ন করে জাতির সঙ্গে তামাশা করা হচ্ছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দিল্লির সঙ্গে কোনো গোপন আঁতাতের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করা হচ্ছে কি না। রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত একটি দল কীভাবে সারা দেশে মিছিল-মিটিং করার সুযোগ পাচ্ছে, সে প্রশ্নও তিনি করেন।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের হত্যাকাণ্ডের বিচার ও জবাবদিহি চায় জনগণ। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত, তাদের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা করা যাবে না। ধ্বংসাত্মক পথ থেকে ফিরে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিকের অধিকার, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায়বিচার—সবকিছুর সমান গুরুত্ব রয়েছে। রাষ্ট্রে কোনো বিশেষ শ্রেণি বা গোষ্ঠীর আধিপত্য থাকবে না। শ্রমিক, কৃষকসহ সব পেশার মানুষের অধিকার নিশ্চিত করে ইসলামী শ্রমনীতির মাধ্যমে মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সভাপতিত্বে সেমিনারে কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মোঃ তসলিমের সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মাওলানা আব্দুস সামাদ।
সেমিনারে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি ড. রেজাউল করিম, পরিবেশ বিজ্ঞানী ও মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. আব্দুর রব, আইনজীবী ও ইসলামী চিন্তাবিদ ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন এমপি, লেখক ও গবেষক ড. আবুল কালাম আজাদ (বাশার), লেখক ও গবেষক মুফতি আলী হাসান ওসামা, হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজসেবক অধ্যাপক ডা. কর্নেল (অব.) জেহাদ খান, সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি হাফেজ রাশেদুল ইসলাম এমপি, তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা, টঙ্গীর অধ্যক্ষ ড. মাওলানা হিফজুর রহমান, ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ।


















