
বাংলাদেশে নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা প্রতিরোধে বিশেষ আইন প্রণয়নের ইতিহাস দীর্ঘ। এর ধারাবাহিকতায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ প্রণীত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০০ সালে। এটি ছিল ২০০০ সালের ৮ নম্বর আইন। এর আগে ১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন এবং তারও আগে ১৯৮৩ সালে নারী নির্যাতন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ কার্যকর ছিল।
আইনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ কঠোরভাবে দমন করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার জন্য বিশেষ কাঠামো তৈরি করা। সময়ের সঙ্গে আইনটি একাধিকবার পরিবর্তিত হয়েছে। সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর মাধ্যমে, যা ১০ এপ্রিল ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়। আইনের বিধান অনুযায়ী এর কিছু সংশোধন ২৫ মার্চ ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে।
কতটা নিশ্চিত হয়েছে নারীর ও শিশুর অধিকার?
আইনটি নারী ও শিশুর জন্য একটি বিশেষ আইনি সুরক্ষা-কাঠামো তৈরি করেছে। ধর্ষণ, যৌতুকজনিত নির্যাতন, নারী ও শিশুর ওপর গুরুতর সহিংসতা এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধনে অপরাধের কিছু সংজ্ঞা আরও স্পষ্ট করা হয়েছে এবং ছেলে শিশুর বিরুদ্ধেও নির্দিষ্ট ধরনের যৌন অপরাধকে আইনের কাঠামোর মধ্যে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য বিভিন্ন বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে আইন থাকাই অধিকার নিশ্চিত হওয়ার শেষ কথা নয়। বাস্তবে তদন্তের মান, সাক্ষ্যপ্রমাণ, সাক্ষীর উপস্থিতি, চিকিৎসা-প্রতিবেদন, প্রসিকিউশনের দক্ষতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা—সবই ফলাফলে প্রভাব ফেলে। ২০০২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত গুরুতর ছয় ধরনের ৭,৮৬৪টি মামলার বিচার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার মধ্যে সাজা হয়েছিল মাত্র ৩ শতাংশ। তবে কম সাজা পাওয়াকে সরাসরি ‘মিথ্যা মামলা’র প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না।
অপব্যবহারের অভিযোগ: কোথায় সমস্যা?
আইনের অপব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে পারিবারিক বিরোধ, দাম্পত্য কলহ, সম্পত্তি বা আর্থিক বিরোধের প্রেক্ষাপটে কখনো কখনো গুরুতর অভিযোগ আনার অভিযোগ ওঠে। এর ফলে নিরপরাধ ব্যক্তি—পুরুষ বা নারী—দীর্ঘ তদন্ত, গ্রেপ্তার, সামাজিক কলঙ্ক এবং আইনি ব্যয়ের মুখোমুখি হতে পারেন।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা জরুরি: কোনো মামলা প্রমাণিত না হওয়া আর মামলা মিথ্যা হওয়া এক বিষয় নয়। প্রথম আলোর বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাব, সাক্ষীর অনুপস্থিতি, তদন্তের দুর্বলতা বা আপসের কারণে মামলা শেষ পর্যন্ত খারিজ বা খালাস হতে পারে; এসব ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিথ্যা মামলা বলা যায় না।
আইন নিজেই মিথ্যা মামলা ঠেকানোর ব্যবস্থা রেখেছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ১৭ ধারায় জেনেশুনে অন্যের ক্ষতি বা মর্যাদাহানির উদ্দেশ্যে ভিত্তিহীন অভিযোগ দায়েরের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। ২০২৬ সালের সংশোধনে এ ধারার কাঠামো আরও পরিবর্তন করা হয়েছে।
পুলিশের ভূমিকা: ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই দিক
এই আইনের বাস্তব প্রয়োগে পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিবাচক দিক হলো—পুলিশ অভিযোগ গ্রহণ, প্রাথমিক তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ, ভুক্তভোগীর চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা এবং আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার মাধ্যমে বিচারপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়। ২০২৫ সালের সংশোধনী এবং পরবর্তী ২০২৬ সালের আইনে তদন্তের সময়সীমা ও প্রক্রিয়াতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে; নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য সময়সীমা ৩০ কার্যদিবস এবং যুক্তিসংগত কারণে আদালতের অনুমোদনে অতিরিক্ত সময়ের বিধান রাখা হয়েছে।
অন্যদিকে নেতিবাচক দিক হিসেবে অভিযোগ রয়েছে—কখনো তদন্তে গাফিলতি, সাক্ষ্য-প্রমাণ যথাযথভাবে সংগ্রহ না করা, বিলম্ব কিংবা অভিযোগের প্রকৃত ভিত্তি যাচাইয়ে দুর্বলতা বিচারপ্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী যেমন ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন, তেমনি মিথ্যা বা দুর্বল অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিও দীর্ঘ হয়রানির শিকার হতে পারেন।
শেষ কথা
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনকে তাই শুধু ‘নারীর সুরক্ষার আইন’ কিংবা ‘পুরুষের বিরুদ্ধে ব্যবহারের আইন’—এই দুই সরল ধারণার কোনো একটিতে সীমাবদ্ধ করা যায় না। এর প্রয়োজনীয়তা যেমন বাস্তব, তেমনি নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়সংগত প্রয়োগের প্রয়োজনও সমান বাস্তব।
আইনের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তখনই, যখন একজন প্রকৃত ভুক্তভোগী দ্রুত সুরক্ষা ও বিচার পাবেন এবং একই সঙ্গে একজন নিরপরাধ ব্যক্তিও মিথ্যা অভিযোগে অযথা হয়রানির শিকার হবেন না। নারী ও শিশুর নিরাপত্তা এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির ন্যায্য বিচার—এই দুই নীতিকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ না বানিয়ে একই বিচারব্যবস্থার দুটি অপরিহার্য স্তম্ভ হিসেবে দেখা দরকার। শেষ পর্যন্ত আইনের সাফল্য শুধু কঠোর শাস্তিতে নয়; বরং সঠিক অভিযোগ শনাক্ত করা, নিরপেক্ষ তদন্ত করা, নির্ভরযোগ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করা এবং প্রকৃত অপরাধী ও নিরপরাধ ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নিশ্চিত করার মধ্যেই।


















