
জাতীয় নাক-কান-গলা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (নিমিউ এন্ড টিসি)-এর হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) এস এম এহসানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) দাখিল করা একটি অভিযোগপত্রে তাঁর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ২০১৪ সালের ১ ডিসেম্বর মাত্র ৫ হাজার ২০০ টাকা বেতনে ১৪তম গ্রেডে হিসাবরক্ষক কাম কোষাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন এস এম এহসান। বর্তমানে একই পদে কর্মরত থেকে তিনি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগকারীর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চাকরিজীবনে তাঁর মোট বেতন-ভাতা বাবদ প্রাপ্ত অর্থ প্রায় ৩১ লাখ টাকা। জিপিএফ বাদ দিলে প্রকৃত বেতন প্রাপ্তির পরিমাণ প্রায় ২৫ লাখ টাকা। অথচ এর বিপরীতে তাঁর ও পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগ করা হয়েছে।
এনআইডি নম্বর: 19872924708164700, জাতীয় পরিচয় নং 19872924708164700 চাকরি শুরু ০১-১২-২০১৪ সালে। পদবি, হিসাবরক্ষক-কাম-ক্যাশিয়ার, বর্তমান ঠিকানা: ১১/৯ সরকারি ডি টাইপ কোয়ার্টার।স্থায়ী ঠিকানা: গ্রাম: ইলিশকোল, উপজেলা: বালিয়াকান্দি, জেলা: রাজবাড়ী
অভিযোগপত্রে এস এম এহসানের নামে মিরপুরে প্রায় ১ হাজার বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (পৃষ্ঠা ১–৪), ফার্মগেটের আরজুত পাড়ায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট (পৃষ্ঠা ১–৪), সাভারে ১০ কাঠা জমির ওপর পাঁচতলা বাড়ি, ফরিদপুরে ১১ কাঠা জমির ওপর ছয়তলা বাড়ি এবং রাজবাড়ীতে পাঁচতলা বাড়ির মালিকানার অভিযোগ করা হয়েছে (পৃষ্ঠা ১–৭)। এসব সম্পদের পক্ষে সম্পদ বিবরণী ও ছবি সংযুক্ত রয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া গাজীপুরে প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর নির্মিত একটি রিসোর্টের মালিকানার অভিযোগও রয়েছে। এ সংক্রান্ত সম্পদ বিবরণী ও ছবি অভিযোগপত্রের ৮ নম্বর পৃষ্ঠায় সংযুক্ত রয়েছে (পৃষ্ঠা ৮)। তাঁর ব্যবহৃত কালো রঙের একটি টয়োটা এলিয়ন গাড়ির তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে, যার নিবন্ধন নম্বর ঢাকা মেট্রো-গ-২১-৬৯৮২। গাড়িটির বিবরণ ও ছবি সংযুক্ত রয়েছে অভিযোগপত্রের ৯–১০ নম্বর পৃষ্ঠায় (পৃষ্ঠা ৯–১০)।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, এস এম এহসান ও তাঁর স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ব্যাংক হিসাব এবং নগদ অর্থ মিলিয়ে প্রায় ৬৭ লাখ টাকার আর্থিক সম্পদ রয়েছে। এ সংক্রান্ত সম্পদ বিবরণী অভিযোগপত্রের ৪ ও ১১ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করা হয়েছে (পৃষ্ঠা ৪ ও ১১)।
ঠিকাদারদের বিল থেকে ১০ শতাংশ অর্থ আদায়ের অভিযোগ
অভিযোগপত্রের অন্যতম গুরুতর বিষয় হচ্ছে, নিমিউ এন্ড টিসির বিভিন্ন ঠিকাদারি বিল ও ভাউচার অনুমোদনের ক্ষেত্রে ১০ শতাংশ অর্থ নেওয়ার অভিযোগ। অভিযোগকারীর দাবি, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নিয়মিত অর্থ দিতে হয়। এমনকি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিল অনুমোদন করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ঠিকাদারদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তবে পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট বিল অনুমোদিত না হলেও আদায় করা অর্থ ঠিকাদারদের ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অভিযোগের বিবরণ অভিযোগপত্রের ১৭ নম্বর পৃষ্ঠায় রয়েছে (পৃষ্ঠা ১৭)।
এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর একজন ঠিকাদারের বিলের অর্থ অন্যজনকে প্রদান করার অভিযোগও উঠেছে। ঠিকাদারদের বিল থেকে ১০ শতাংশ অর্থ গ্রহণ এবং বিলের অর্থ বিতরণে অনিয়মের এসব অভিযোগের বিবরণ অভিযোগপত্রের ১৭–২০ নম্বর পৃষ্ঠায় তুলে ধরা হয়েছে (পৃষ্ঠা ১৭–২০)।
আউটসোর্সিং নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ
প্রতিষ্ঠানের ৩৩ জন আউটসোর্সিং কর্মীর মধ্যে এস এম এহসানের ছয়জন ভাই ও আত্মীয় রয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাঁর প্রভাব ও স্বজনপ্রীতির বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারী। এ সংক্রান্ত তথ্য অভিযোগপত্রের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে (পৃষ্ঠা ১৬)।
অন্যদিকে, ক্যাশ ভাউচার, গাড়িচালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার ভাতা এবং প্রশিক্ষণ ভাতার অর্থ উত্তোলনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, এসব অর্থ তাঁর নামে ক্যাশ করে উত্তোলন করা হয় এবং সেখান থেকেও ১০ শতাংশ অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এ সংক্রান্ত বিবরণ রয়েছে অভিযোগপত্রের ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় (পৃষ্ঠা ২১)।

কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও হয়রানির অভিযোগ
এস এম এহসানের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানের চিফ টেকনিক্যাল ম্যানেজার জয়ন্ত কুমার মুখোপাধ্যায়, টেকনিক্যাল ম্যানেজার (রিপেয়ার) গোলাম মোস্তফা, সরবরাহ ও সংগ্রহ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করে তাঁদের হয়রানি করার অভিযোগও আনা হয়েছে। এ সংক্রান্ত অভিযোগ ও নথির বিবরণ অভিযোগপত্রের ১২–১৫ নম্বর পৃষ্ঠায় সংযুক্ত রয়েছে (পৃষ্ঠা ১২–১৫)।
অভিযোগকারীর দাবি, হিসাবরক্ষণ শাখায় একটি মাত্র পদ থাকায় এস এম এহসান দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি-ধমকি এবং বিভিন্নভাবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানি করার অভিযোগও রয়েছে। এ বিষয়ে অভিযোগপত্রের ২২ নম্বর পৃষ্ঠায় বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে (পৃষ্ঠা ২২)।
দুদকের অনুসন্ধান দাবি
অভিযোগপত্রে এস এম এহসানের কথিত সম্পদের উৎস, চাকরির আয় ও বর্তমান সম্পদের মধ্যে সামঞ্জস্য, ব্যাংক হিসাব, এফডিআর, সঞ্চয়পত্র, জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি, রিসোর্ট এবং গাড়ির মালিকানা যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে। পাশাপাশি ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়, বিলের অর্থ স্থানান্তর, আউটসোর্সিং নিয়োগে স্বজনপ্রীতি এবং বিভিন্ন ভাতা উত্তোলনের বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
একজন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে সীমিত বেতন-ভাতার বিপরীতে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে অর্জিত হয়েছে, এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা কার নামে এবং অর্থের উৎস কী—তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারী।
এস এম এহসানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।


















