
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে রাজধানী নয়াদিল্লি। শহরের জন্তর মন্তরে সমাবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২০ হাজারের বেশি পুলিশ ও কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে বন্ধ রাখা হচ্ছে মেট্রোর একাধিক স্টেশনের প্রবেশপথ, কিছু ট্রেন চলাচল এবং নির্দিষ্ট এলাকায় ইন্টারনেট সেবা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ জুলাইয়ের বিক্ষোভের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এবার আগে থেকেই ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। সেদিন প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলন চলাকালে বিশৃঙ্খলা ও পুলিশের পদক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। ওই ঘটনার পর শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেন। এবারের বিক্ষোভও বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পুলিশ বিক্ষোভের অনুমতি না দিলেও পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতোমধ্যে বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
রাজীব চক, নয়াদিল্লি, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, প্যাটেল চক ও কাশ্মীরি গেটসহ দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশনের প্রবেশ ও বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন স্টেশনে পৌঁছানোর কথা ছিল—এমন অন্যান্য রাজ্য থেকে আসা ২৫০টির বেশি ট্রেন এবং স্থানীয় ট্রেনের চলাচল বাতিল করা হয়েছে।
অন্যদিকে, শুক্রবার রাত ১০টা থেকে জনপথ-কর্তব্য পথ মোড়ের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় ২৪ ঘণ্টার জন্য ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখা হয়েছে।
এতসব বিধিনিষেধের মধ্যেও বিক্ষোভের পরিকল্পনা থেকে সরে আসেনি সিজেপি। দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপক জানিয়েছেন, স্বেচ্ছাসেবক ও সমর্থকেরা নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী জন্তর মন্তরে যাওয়ার প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারের পদক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, বিক্ষোভের কারণে জনদুর্ভোগের আশঙ্কা দেখিয়ে কর্তৃপক্ষ যখন মেট্রো ও ট্রেন বন্ধ করছে এবং সড়কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে, তখন এসব সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে না কেন?
দিল্লি পুলিশের নিরাপত্তা পরিকল্পনা
বিক্ষোভ মোকাবিলায় দিল্লি পুলিশের পরিকল্পনায় দুটি বিষয়কে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রথমত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। দ্বিতীয়ত, বিক্ষোভকারীদের সামলাতে গিয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে যেন নতুন করে অসদাচরণ বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ না ওঠে, তা নিশ্চিত করা।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিক্ষোভকারীদের নয়াদিল্লি জেলায় প্রবেশ ঠেকানো এবং নিষিদ্ধ এলাকা থেকে দ্রুত সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
জন্তর মন্তর, জনপথ, ভারতের নির্বাচন কমিশনের কার্যালয় ও দিল্লি পুলিশ সদর দপ্তরসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো নিয়ে প্রায় দেড় কিলোমিটার ব্যাসার্ধের একটি এলাকাকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে ৬ হাজার ৫০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পুরো এলাকাটি কঠোর নিরাপত্তার আওতায় চলে আসবে।
নজরদারি বাড়াতে নয়াদিল্লি জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অডিও রেকর্ডিংয়ের সুবিধাসহ ৩০০টির বেশি সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে বিক্ষোভের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
জন্তর মন্তরে সাত স্তরের ব্যারিকেড
বিক্ষোভের সম্ভাব্য কেন্দ্র জন্তর মন্তরে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। সেখানে যাওয়ার রাস্তায় অন্তত সাত স্তরের ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। শেষের দিকের কয়েকটি ব্যারিকেড ঝালাই করে যুক্ত করা হয়েছে, যাতে সেগুলো সরিয়ে বা ভেঙে সামনে এগিয়ে যাওয়া কঠিন হয়।
এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থানে লাউডস্পিকার স্থাপন করা হয়েছে। রেকর্ড করা ঘোষণার মাধ্যমে জানানো হচ্ছে, প্রস্তাবিত বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে লোকজনকে সেখানে জমায়েত না হওয়া, স্লোগান না দেওয়া, সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি না করা এবং পুলিশের ওপর হামলা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।
কমিউনিটি সেন্টার, মসজিদ ও আবাসিক কল্যাণ সমিতিগুলোকেও বিক্ষোভের অনুমতি না থাকার বিষয়টি জানাতে বলা হয়েছে। কর্মসূচিতে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে আসা ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কেও সতর্ক করা হয়েছে।
নিরাপত্তা তৎপরতার অংশ হিসেবে নয়াদিল্লি ও মধ্য দিল্লির বিভিন্ন লজ ও হোটেলে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। হোটেল কর্তৃপক্ষকে অতিথিদের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে নিরুৎসাহিত করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি এয়ারবিএনবির মাধ্যমে বাসা ভাড়া দেওয়া ব্যক্তি ও সম্পত্তির মালিকদেরও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কাছে বাসা ভাড়া না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


















