
“আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তবে অটোমেশনকে চাকরি কমানোর উপায় হিসেবে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে”— মো. রফিকুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক, উইন্টার ড্রেস লিমিটেড “দ্রুত কাজ সম্পাদনে শ্রমিকদের বিকল্প হিসেবে গার্মেন্টেসে এআই-অটোমেশন ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ১২ লাখেরও বেশি পোশাক শ্রমিক চাকরি হারাতে পারে। তবে এর মধ্যে ৬০ শতাংশ নারী বেকারত্ব হতে পারে”— সিপিডি।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক শিল্প। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় অংশ আসে এই খাত থেকে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে এখন কারখানাগুলোতে যুক্ত হচ্ছে আধুনিক অটোমেশন, স্মার্ট মেশিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক প্রযুক্তি। এতে উৎপাদনের গতি বাড়ছে, কমছে সময় ও উৎপাদন ব্যয়। এর ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে দ্রুতই বাড়ছে এআই এবং অটোমেশনের ব্যবহার। এতে একদিকে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। সিপিডির এক গবেষণায় ১২ লাখের বেশি শ্রমিক চাকরি হারানোর আশঙ্কার কথা বলা হলেও শিল্পমালিকরা বলছেন বাস্তবতা ভিন্ন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক (RMG) খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং অটোমেশনের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সাহায্য করছে। তবে সস্তা শ্রমের সহজলভ্যতার কারণে এই প্রযুক্তিগুলোর গ্রহণের হার এখনও সব কারখানায় সমান নয় এবং এটি মূলত বড় ও মাঝারি সারির কারখানাগুলোর মধ্যে বেশি সীমাবদ্ধ। পোশাক তৈরির বিভিন্ন ধাপে অটোমেশন এবং এআই প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যাচ্ছে: ১. ডিজাইনিং ও স্যাম্পলিং: ৩ডি ফ্যাশন ডিজাইন সফটওয়্যার ও ভার্চুয়াল প্রোটোটাইপিংয়ের মাধ্যমে ফেব্রিক অপচয় কমিয়ে দ্রুত আন্তর্জাতিক বায়ারদের চাহিদা অনুযায়ী স্যাম্পল তৈরি করা হচ্ছে।
২. ফেব্রিক কাটিং ও স্প্রেডিং: লেজার কাটিং ও ডিজিটাল প্যাটার্নিংয়ের মতো আধুনিক সেমি-অটোমেটেড ও ফুল-অটোমেটেড মেশিনের ব্যবহার অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে সুইটার ও জ্যাকেট কারখানায় কাটিংয়ে অটোমেশনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। ৩. উৎপাদন ও রিয়েল-টাইম মনিটরিং: সেলাই মেশিনে আইওটি (IoT) সেন্সর এবং এআই-চালিত ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা যুক্ত করে কারখানায় উৎপাদন লাইন ট্র্যাক করা হচ্ছে, যা উৎপাদনশীলতা ২৫% পর্যন্ত বাড়াতে পারছে। ৪. কোয়ালিটি কন্ট্রোল (QC Check): ফেব্রিক বা পোশাকের সুক্ষ্ম ত্রুটি দ্রুত ও নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করার জন্য কম্পিউটার ভিশন এবং এআই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।
শিল্প গবেষণা ও বিভিন্ন ডেটা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের সাড়ে ৪ হাজারেরও বেশি সক্রিয় পোশাক কারখানার মধ্যে প্রযুক্তি গ্রহণের চিত্রটি নিম্নরূপ:
সূচক ও প্রযুক্তির ধরণব্যবহারের হার/সংখ্যাপ্রভাব ও প্রাসঙ্গিক তথ্যঅটোমেশনের সম্মুখীন শ্রমিক২৫% এর বেশি (২০২২ সালের তথ্যমতে) অন্তত ২৫% পোশাক শ্রমিক ইতিমধ্যে কোনো না কোনো স্তরের অটোমেটেড মেশিনের সাথে কাজ করছেন। আইওটি (IoT) ভিত্তিক মেশিন মনিটরিং ১৮% কারখানাপ্রধানত শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক (যেমন: বেক্সিমকো, ডিবিএল গ্রুপ) এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এআই-ভিত্তিক কোয়ালিটি ও প্ল্যানিং ১২% এর কম কারখানাকোয়ালিটি কন্ট্রোল এবং উৎপাদন পরিকল্পনা অপ্টিমাইজেশনে এআই-এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক স্তরে রয়েছে। ইআরপি (ERP) সিস্টেম ব্যবহার ৩৫% এর কম কারখানাডাটা ও ব্যাক-অফিস ব্যবস্থাপনার জন্য ৩৫ শতাংশের কম কারখানা এআই বা ডিজিটাল ইআরপি ব্যবহার করে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ৪.১৯% বার্ষিক বৃদ্ধি (২০১৪-২০২৩) প্রযুক্তি গ্রহণের ফলে জ্যাকেট (৬.৫৯%), নিট-লিঙ্গারি (৬.৪৩%) ও সোয়েটার (৬.০৫%) উপখাতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
শ্রম প্রতিস্থাপন হার ৩১% শ্রমিক হ্রাস (অটোমেটেড প্রক্রিয়ায়) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক অটোমেশন চালুর ফলে সংশ্লিষ্ট সেকশনগুলো থেকে বিশেষ করে হেল্পার স্তরের ৩১% মানুষের শ্রম চাহিদা কমেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তৈরি পোশাক কারখানার এক শ্রমিক বলেন, আমরা সুতা থেকে কম্পিউটারে মেশিন আধুনিক যে মেশিন আছে, মেশিনে কম্পিউটারে প্রোগ্রাম সেট করে দেই। সেট করার পার্ট অনুসারে বানায়। সেটা আবার মেকআপে তৈরি করে সোয়েটারে রূপান্তরিত হয়। অন্য একজন বলেন, এখানে সবকিছু অটোমেটিক মেশিনে কমপ্লিট হয়ে আসে। আমরা শুধু স্যুইংয়ের লেভেল লাগে, ফিনিশিং কমপ্লিট করি।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এআই এবং দ্রুত অটোমেশনের ফলে ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের পোশাক খাতে প্রায় ১২.২ লাখ (১.২২ মিলিয়ন) কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে, যার মধ্যে নারী শ্রমিকদের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি (প্রায় ৬০%)। তাই টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য বর্তমানে তৈরি পোশাক খাতের মালিক ও সরকার শ্রমিকদের পুনঃদক্ষতা (Reskilling) নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছেন। তবে প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, যথাযথ দক্ষতা উন্নয়ন না হলে ভবিষ্যতে নারী শ্রমিকারা বেশি কর্মসংস্থানের ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা গেলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ভবিষ্যতেও বৈশ্বিক বাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে পারবে। প্রযুক্তির অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। তবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে শ্রমিকদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলেই যেমন উৎপাদন বাড়বে, তেমনি কর্মসংস্থানও হবে আরও টেকসই, এমনটাই মনে করছেন শিল্প সংশ্লিষ্টরা।
তবে শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তি এলেও পোশাক তৈরির প্রতিটি ধাপেই এখনো মানুষের বিকল্প নেই। কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং, কোয়ালিটি চেকিং থেকে শুরু করে প্যাকেজিং, সব ক্ষেত্রেই দক্ষ শ্রমিক অপরিহার্য। তারা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে প্রযুক্তির বিকল্প নেই। তবে অটোমেশনকে চাকরি কমানোর উপায় হিসেবে নয়, বরং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর প্রযুক্তি হিসেবে দেখছেন তারা। একইসঙ্গে শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে উইন্টার ড্রেস লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, অটোমেশন আসছে আপনার যেসব জায়গাগুলো আপনার ক্রিটিক্যাল জোন। যেমন ধরেন নিটিং করতে হবে, যেমন হয়তো ওয়াশ করতে হবে, যেমন একটা মালকে এক্সপোর্ট করার সময় কার্টুন লোড দিতে হবে মাথায় করে, সেটাকে অটোমেশন করে এখন ডিরেক্ট গাড়িতে চলে যাচ্ছে। এই টাইপের আরকি অটোমেশন। ম্যানপাওয়ার কমবে না, বরঞ্চ ম্যানপাওয়ারের স্কিল তৈরি হবে যেটা বহির্বিশ্বের সঙ্গে আরও মান উন্নয়নের জন্য সুবিধা হবে।


















