
বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে ৬৮ বিধির আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ এ তথ্য জানান।
দেশে চলমান তীব্র জ্বালানি ও গ্যাস সংকটের জন্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি, অদূরদর্শিতা এবং দলীয় ব্যবসায়ীদের স্বার্থরক্ষাকে দায়ী করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাদের অনুগত ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে সুবিধা দিতে গিয়ে বিদেশিনির্ভর জ্বালানি নীতি গ্রহণ করেছিল। একই সঙ্গে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই ভঙ্গুর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশে বর্তমানে যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে, তা পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনার ফল।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন প্রস্তাবের জবাবে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই আন্তর্জাতিক পরিসরে গালফ ওয়ারের মতো সংকট তৈরি হয়। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দামে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। তবে দেশের কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনায় বোরো মৌসুমে সেচ কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গত ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়নি।
পরবর্তীতে সীমান্ত এলাকায় জ্বালানি তেল পাচার রোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি মোকাবিলায় তেলের দাম সহনীয় পর্যায়ে পুনর্নির্ধারণ করতে হয়েছে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বাড়তি কর না চাপিয়ে সাধারণ মানুষের আর্থিক চাপ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
দেশের এলএনজি ঘাটতি মেটানো ও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সালাউদ্দিন আহমদ বলেন, সমুদ্রে ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপন সময়সাপেক্ষ হলেও সরকার দ্রুত পদক্ষেপে বিশ্বাসী। মাতারবাড়ীতে চীন সরকারের সঙ্গে ‘জি টু জি’ চুক্তির আওতায় তৃতীয় এফএসআরইউ ১৮ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে মাতারবাড়ীতে একটি ল্যান্ড বেজড বা ভূমিনির্ভর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প থেকে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় শত কিলোমিটার উন্নতমানের পাইপলাইন নির্মাণের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া চলছে।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন ও দেশীয় সম্পদের ব্যবহারের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশীয় কয়লার সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ঘাটতি পূরণে বড় পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। বড়পুকুরিয়ার দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে ৬০০ মেগাওয়াটের একটি নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বিদ্যমান বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজনীয় সংস্কারকাজও চলছে।
বৈশ্বিক আর্থিক সীমাবদ্ধতা ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বন্ধের বিধিনিষেধের মধ্যেও ২০২১ সালের আগের চুক্তির আওতায় পায়রা দ্বিতীয় পর্যায়ের ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ দ্রুত শুরুর বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সরকারের ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে বলেও জানান তিনি।
সঞ্চালন ও গ্রিড লাইনের ঘাটতি দেখা দিলে সরকার নিজস্ব জিওবি তহবিল থেকে অর্থায়ন করে প্রয়োজনীয় গ্রিড লাইন নির্মাণ করবে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের অংশ হিসেবে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও এলপিজি ব্যবহারে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন সালাউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় অনশোর ও অফশোর এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান করা হয়নি। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর অনশোর ও অফশোর উভয় এলাকায় কূপ খনন ও অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরদার করেছে।
এরই মধ্যে ভোলায় গ্যাস উত্তোলনের উদ্যোগ সচল করা হয়েছে। সেখানে পাওয়া গ্যাসকে কাজে লাগিয়ে সার কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি দেশে এলপিজির চাহিদা মেটাতে মাতারবাড়ীতে বড় আকারের এলপিজি টার্মিনাল ও স্টোরেজ অবকাঠামো নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সময়সীমার প্রসঙ্গ টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, একটি সরকার যখন ভঙ্গুর আর্থিক ও জ্বালানি ব্যবস্থা উত্তরাধিকারসূত্রে পায়, তখন সবকিছু রাতারাতি পরিবর্তন করা কঠিন। তবে প্রধানমন্ত্রী মাত্র ছয় মাসের মধ্যে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার যে মহাপরিকল্পনা বা ‘আই হ্যাভ প্ল্যান’ নীতি গ্রহণ করেছেন, তা ইতোমধ্যে কার্যকর হতে শুরু করেছে।


















